We are available at

হাঁটু ব্যাথা: প্রকৃত কারণ ও প্রতিকার

হাঁটু বাথাঃ কারণ ও প্রতিকার

লিখেছেন—Dr.Md Year Ali Sk, Medical Officer

Expertized in All Chronic Illness

আমাদের (মানুষের) বয়ঃবৃদ্ধির সাথে সাথে , যে সব অসুখগুলি মানুষকে হাঁটা চলা, চলা ফেরা, কাজ কর্মে অক্ষম বা পঙ্গু করে তুলে ,তারমধ্যে হাঁঁটু ব্যাথা অন্যতম৷ বর্তমান প্রেক্ষাপট ও সময়ে প্রতি বছর গড়ে ৩০ জন নতুন করে এই হাঁটু ব্যাথায় আক্রান্ত হয় প্রতি ১০০০ জনের মধ্যে৷ পুরোনো যারা ভুগছিলেন তারা তো আছেই! মহিলাদের ক্ষেত্রে হাঁটু ব্যাথার প্রবণতা পুরুষদের তুলনায় কিছুটা বেশী৷ প্রত্যেক পরিবার , সমাজে কমবেশি অনেকেই এই দূরারোগ্য( প্রচলিত বদ্ধমূল ধারণা, যদিও সম্পূর্ণ নির্মূল হয়ে যায়) হাঁটু ব্যাথার সমস্যাই ভূগছেন৷ এখন তো অল্প বয়সেই হাঁটু ব্যাথায় অনেকেই আক্রান্ত৷

চলুন, আগে হাঁটু জয়েন্ট নিয়ে সাধারণ কয়েকটি কথা বা গঠণ ও কাজ কর্ম দেখে নিই৷

এনাটমি ও ফিজিওলোজিঃ হাঁটু বা Knee Joint দুটো হাড়ের প্রান্তীয় অংশ দিয়ে গঠিত৷ উপরের দিকে ফিমার ও নিচের দিকে টিবিয়া৷ বল-বিয়ারিং এর মত দুটো হাড়ের মাঝে দুটো ছোট ছোট স্পন্জের মত নরম অথচ শক্তিশালী মেনিস্কাস থাকে৷ এই দুটি মেনিস্কাস দুটো হাড়ের মাঝে গদির (Shock Absorber) মত কাজ করে৷ পুরো জয়েন্টটা একটা আবরন দিয়ে ঘেরা থাকে এবং এই আবরনের মধ্যে জেলির মত স্বচ্ছ তরল পদার্থ থাকে ৷ একে সাইনোভিয়াল ফ্লুইড বলে৷ ঐ আবরনটিকে সাইনোভিয়াল মেমব্রেন বলে৷ সাইনোভিয়াল মেমব্রেন যে কোষ দিয়ে তৈরী তাকে সাইনোভিয়োসাইট বলে৷ এই কোষের বিশেষ কাজ হল — সাইনোভিয়াল ফ্লুইড তৈরী করা৷ অনবরত এই ফ্লুইড তৈরী হয় এবং পুরোনো হয়ে যাওয়া সাইনোভিয়াল ফ্লুইড লিম্ফাটিকস ও শিরার মাধ্যমে জয়েন্টের ভিতর থেকে ড্রেনেজ হয়ে যায়৷ প্রান্তীয় হাড়ের কিনারাতে নরম তরুনাস্থি বা কার্টিলেজ থাকে৷ এগুলি হাড়ের স্থায়িত্ব দান করে এবং হাড়ে হাড়ে টক্বর লাগাকে প্রতিহত করে৷ এই কার্টিলেজ কন্ড্রোসাইট কোষ থেকে তৈরী হয়৷ সাইনোভিয়াল ফ্লুইড কমে গেলে বা এর গুণাগুণে খামতি হলে, কার্টিলেজের ( উপরের) সঙ্গে কার্টিলেজের( নিচের) ঠুকাঠুকিতে তাদের ক্ষয় হয়৷ এটাও ক্ষয়ে শেষ পর্যায়ে চলে এলে, উপরের হাড়ের সঙ্গে নিচের হাড়ের ঠুকাঠুকিতে বা ঘর্ষণে হাড়েরও ক্ষয় হতে শুরু করবে৷ মেনিস্কাস সর্বপ্রথম ক্ষয় হতে শুরু করে৷ মেনিস্কাসের পুষ্টি সাইনোভিয়াল ফ্লুইড থেকেই আসে৷

টিবিয়া হাড়ের উপরের প্রান্তীয় অংশের মধ্যবর্তী অংশ থেকে দুটো লিগামেন্ট উৎপত্তি হয়ে জয়েন্টের মধ্যেই ফিমারের নিচের প্রান্তীয় অংশের দুটো জায়গায় আবদ্ধ হয়ে যায়৷ এই দুটো লিগামেন্ট সামনে-পিছনে, উপর-নিচে এই দুই হাড়কে জয়েন্ট এর মধ্যেই এমন শক্ত ও মজবুতভাবে ধরে রাখে যে, হাঁটুকে পিছন দিকে বাঁকানো যায়না৷ এবং নিচের টিবিয়া হাড়টিকে জয়েন্ট থেকে সামনে পিছনে স্লিপ করানো যায় না৷
এছাড়াও, হাঁটুর দুই পাশে , সামনে পিছনে লিগামেন্ট আছে৷ থাই মাসলগুলির টেন্ডন আছে৷ হাঁটুর সামনে প্যাটেলা বা মালইচাকী আছে৷ হাঁটু জয়েন্টের সামনে কোয়াড্রিসেপস ফিমোরিস, বাইরের দিকে বাইসেপস ফিমোরিস, ইলিও টিবিয়াল,ভিতর দিকে সেমি টিন্ডিনোসাস টেন্ডনগুলি টাইটভাবে জয়েন্টকে দঁড়ির মত ধরে রেখেছে৷ পিছন দিকে পপলীটিয়াল মাসল আছে৷

হাঁটুর পিছন দিকে পপলিটিয়াল ভেসেলস, লিম্ফ, নার্ভ থেকে পাঁচটি ভাগে পুরো হাঁটুতে রক্ত সরবরাহ হয় ও স্নায়ু সাপ্লাই থাকে৷ এই আর্টারি দিয়েই হাঁটুতে যাবতীয় পুষ্টি সরবরাহ হয়৷ প্যাটেলার উপরে নিচে ও দুই পাশে স্পন্জের মত বার্সা ( গোলাকার , না নরম -না শক্ত) থাকে৷ লিগামেন্ট বা ক্যাপসুল বা সাইনোভিয়াল ফ্লুইডকে হাঁটুর সামনে সরাসরি আঘাত বা চাপ থেকে রক্ষা করতে এই বার্সা খুবই দরকারী৷

থাই মাসলগুলির কন্ট্রাকশন বা রিলাক্মেশন হলে , টেন্ডনগুলি সংকুচিত বা প্রসারিত হয়৷ এই সময় হাঁটু জয়েন্টে ভাঁজ বা খোলা হয়৷ অর্থাৎ হাঁটুর স্বাভাবিক মুভমেন্ট হয়৷

হাঁটু ব্যাথার ( কোন এক্মিডেন্ট বা আঘাত জনিত সমস্যা বাদ দিয়ে) সূত্রপাত কীভাবে?

হাঁটু থেকে উপরের বডির পুরো অংশের ওজন হাঁটা চলার সময় হাঁটুর উপরে এসে পড়ে৷ সেই ২—৩ বছর বয়স থেকে শুরু হয়ে আমৃত্যু চলতে থাকে! ফলতঃ হাঁটুর বিভিন্ন গঠণগত অংশগুলির উপর অনবরত চাপে কিছুটা হলেও দূর্বলতা আসে বা ক্ষয় হয়৷ সাইনোভিয়াল মেমব্রেনের পরিপূর্ণ সক্ষমতা ও কার্যকারিতাতে ব্যাঘাত ঘটে৷ হাঁটুর মধ্যে থাকা জল বা সাইনোভিয়াল ফ্লুইড কমে যায়৷ এই ফ্লুইড থেকে পুষ্ট হওয়া মেনিস্কাসও দূর্বল ও চুপসে যেতে শুরু করে৷ ফলে, হাঁটুর দুই হাড়ের মাঝের যে গ্যাপ বা দূরত্ব সেটা কমে যায়৷ দুই হাড়ের দুই প্রান্ত পরস্পরের কাছাকাছি চলে আসাতে জয়েন্টের মুভমেন্ট কমে যায়৷ এক্ষেত্রে, যদি এই জয়েন্টের মধ্যে কোন রকম ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস বা প্যাথোজেন না প্রবেশ করে, তবে এই জাতীয় হাঁটুর সমস্যায় ফোলা, ব্যাথা কম হবে বা থাকবেনা; কিন্তূ হাঁটু জমে যাওয়া বা স্টিফ হয়ে যাওয়া বা মুভমেন্ট থাকবেনা বা কম হবে৷ এই রকম সমস্যা অধিকাংশ বয়স্ক লোকেরই হয়৷ সাইনোভিয়াল মেমব্রেনে সরবরাহিত আর্টারি চুপসে গিয়ে বা আংশিক বা সম্পূর্ণ ব্লক হলেও এই সমস্যা অহরহ আসতে পারে৷ বয়স বাড়ার সাথে সাথে যেহেতু, লিভার বিভিন্ন বিষাক্ততায়( কেমিক্যালস, ফার্টিলাইজার, কীটনাশক, হেভি মেটালস, চর্বি প্রভৃতি) কনজেষ্টেড, ফ্যাটি, স্লাগিশ, অভারবার্ডেন্ড হয়ে যায়,সেহেতু রক্তের মধ্যেও ঐ বিষাক্ততা ছড়িয়ে পড়ে৷ রক্তের ঘনত্ব বাড়তে থাকে৷ ঘন ব্লাডের ধমনী বা শিরার মধ্যে প্রবাহমানতা কমে যায়, শিরার বা ধমনীর গায়ে চর্বি জমতে থাকে, ধমনী শক্ত হয়ে যায়, ছোট বা সরু হয়ে যায়৷ ফলে, ধমনীগুলি রক্তের গাঢ়ত্বের অনুপাতে আস্তে আস্তে ব্লক হয়ে যায়৷ এই সময়, ঐ ধমনী যে কোষ বা টিসুতে রক্তের মাধ্যমে পুষ্টি সরবরাহ করছিল সেটাও আস্তে আস্তে কমতে থাকে৷ অবধারিতভাবেই, ঐ টিসুর স্বাভাবিক কাজ বিঘ্নতাপ্রাপ্ত হয়৷ ফলে, সাইনোভিয়াল মেমব্রেন থেকে অনবরত যে সাইনোভিয়াল ফ্লুইড তৈরী করছিল—সেটা গুণগতভাবে ও পরিমানগতভাবে কমে যাবে৷ অতঃপর , পরবর্তীতে জয়েন্টের অন্যান্য অংশগুলির ক্ষতিগুলি স্টেপ বাই স্টেপ আসবে৷ হাঁটু ব্যাথা ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকবে৷

এবার যদি, জয়েন্টের মধ্যে কোন ভাইরাস বিশেষ করে EBV কোন ক্রমে প্রবেশ করে ,তবে সাইনোভিয়াল মেমব্রেন, মেনিস্কাস, কার্টিলেজ, বোন সবাজায়গাতেই এক সঙ্গে প্রদাহ তৈরী করবে৷ ওখানে দেহের ইমিনিটি কোষ ও ভাইরাসের মধ্যে যুদ্ধ বা ইমুউনোলজিক্যাল রিয়েকশন হবে৷ ফলে, আরও দ্রুত ক্ষয় হবে৷ এক্ষেত্রে, সাইনোভিয়াল ফ্লুইড ইনফ্লামেটরি ফ্লুইড দ্বারা রিপ্লেস হয়ে যাবে৷ ফলে, প্রচন্ড যন্ত্রণা, ফুলে যাওয়া, স্টিফনেস প্রভৃতি বৃদ্ধি পাবে৷

ব্যাকটেরিয়া হলে, রেডনেস ও ফিভার থাকতে পারে (সেপসিস)
যেহেতু, লিভার ও EBV বহু ক্রনিক রোগের মূল কারিগর, সেহেতু, হাঁটু ব্যাথার রোগীদের

প্রেসার, সুগার, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, অটোইমিউন ডিজিজ, থাইরয়েড, ওবেসিটি, গ্যাসের সমস্যা, ঘুমের সমস্যা, কোমর ঘাড় ব্যাথা, বাত প্রভৃতি থাকাটা খুবই স্বাভাবিক৷ 4 র্থ স্টেজে, শক্তিশালী স্ট্রেইন (EBV) ১০০ শতাংশ হাঁটুর বাত সৃষ্টি করে৷

লক্ষণসমূহঃ

১) ব্যাথা’,
২)স্টিফনেস,
৩)কড় কড় শব্দ,
৪)ফুলে যাওয়া,
৫)হাঁটু সোজা করে হাঁটতে না পারা প্রভৃতি৷

প্রতিকারঃ

১)যে কোন প্রকার হাঁটু ব্যাথাতে এক্কেবারে প্রথম অবস্থাতেই হিজামা করা৷

২)EBV ধ্বংশকারী ফুড ও সাপ্লেমেন্ট যেমন—Cat’s Claw, Zaitus প্রভৃতি নিয়োমিত গ্রহণ করা৷
এবং Liver ও Blood থেকে EBV কে ডিটক্সিফিকেশণ করতে 28 Days Healing Cleanse মেনে চলা৷
৩)সাইনৈভিয়াল ফ্লুইডের উপাদান Hyaluronic Acid ( Injection হিসাবে হাঁটুতে পুস করা হয়৷) Chondroitin MSM গ্রহন করা৷
৪) যায়তুন তেল(.২—.৫% acidity) গ্রহন করা৷ কারণ, সাইনৈভিয়াল ফ্লুইডের সিন্থেসিস বৃদ্ধি করে ৷
৫)Calsium , Magnesium, Glucosamine বোন ও কার্টিলেজের পুষ্টির জন্য গ্রহণ করা৷

সমস্ত পুষ্টি তখনই জয়েন্টে পৌঁছাবে যখন ধমনীগুলি সতেজ, পুরোপুরি খোলা থাকবে৷ তাই, ধমনী শিরাকে খুলতে, সতেজ করতে, ব্যাথা সৃষ্টিকারী ক্যামিকেলসগুলি নিষ্কাষন করতে হিজামা করতেই হবে৷ কোন বিকল্প নাই৷
৬) হাঁটুর হাড় অতিরিক্ত ক্ষয় হলে বা শেষ অবস্থায় চলে গেলে TKR অপারেশন রিহাবিলেটশনের জন্য সহায়ক৷
৭) ব্যাথা প্রচন্ড হলে, সাময়িক NSAIDs খেতে পারেন৷
তবে, হাঁটুতে স্টেরয়েড ইনজেকশন কিছুদিনের জন্য ইমিউনিটি ও ইনফ্লামেশন কমালেও, পরবর্তীতে ঢের ক্ষতিকর৷ অতএব, এড়িয়ে চলাই উত্তম৷

ধন্যবাদান্তে,
ডাঃ ইয়ার আলি

Leave a Comment

Your email address will not be published.

eleven − 9 =